আপনি কি জানেন আপনার শিশু বড় হয়ে কি হওয়ার স্বপ্ন দেখে? শিশুর বয়স যখন ৪ বছর হয়, তখন থেকেই সে বড় হয়ে কি হতে চায় তার স্বপ্ন দেখা শুরু করে। অনেকেই হতে চায় ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার, আবার অনেকেই হতে চায় আলাদা কিছু – যেমন গায়ক, আর্টিস্ট, অভিনেতা বা খেলোয়াড়। আবার কেউবা সুপারহিরো।

স্বাভাবিকভাবেই আমাদের মাথায় প্রশ্ন এসেছিল, বাংলাদেশের শিশুরা সাধারণত বড় হয়ে কি হতে চায়? কোন কোন প্রফেশনগুলো বা কাজগুলো তাদের কাছে খুব আকর্ষণীয়? আর কেনই বা তারা বড় হয়ে তা হতে চায়?

গত অক্টোবর মাসের ১৯-২০ তারিখে আমরা আয়োজন করেছিলাম সিসিমপুর মেলার। সেখানে এসেছিল নানা বয়সী (বেশিরভাগই ৪-১০ বছর) প্রায় ৮০০০ শিশু। ‘ইচ্ছেগাছ’ নামের একটি চমৎকার কনটেন্ট আছে সিসিমপুরের। সেখানে শিশুরা বড় হয়ে কি হতে চায় সেটি লিখেছে। আমরা প্রায় ১০০০ শিশুর ইচ্ছের কথা জেনেছি সেখান থেকে। সেগুলোকে যখন আমরা স্টাডি করলাম দেখলাম শিশুরা মোট ৭৪ ধরণের প্রফেশন বা ইচ্ছের কথা লিখেছে যা তারা বড় হয়ে করতে চায়। কি নেই সেখানে?

ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার থেকে শুরু করে অস্কার জেতা অভিনেতা, লেখক, নাসার বিজ্ঞানী, শিক্ষক; এমনকি প্রেসিডেন্ট পর্যন্ত আছে।

সেখান থেকে আমরা জানার চেষ্টা করলাম যে সবচেয়ে জনপ্রিয় প্রফেশনগুলো আমাদের বাংলাদেশের শিশুদের মধ্যে। সেখান থেকে সেরা ১০ টি প্রফেশন বা Career এর লিস্ট দেয়া হল নিচে।

১০। খেলোয়াড়

সেরা ১০ এ আছে শিশুদের মধ্যে খেলোয়াড় হওয়ার স্বপ্ন। তারা বড় হয়ে ক্রিকেটার বা ফুটবলার হতে চায়।

৯। আর্টিস্ট

তালিকায় ৯ নাম্বারের পছন্দের স্বপ্ন হচ্ছে আর্টিস্ট হওয়ার ইচ্ছে। শিশুরা যেহেতু ছোটবেলা থেকেই আঁকাআঁকি করতে খুব ভালোবাসে, তাই সে হিসাবে ‘আর্টিস্ট’ হওয়ার ইচ্ছে ৯ নাম্বারে আসাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কিন্তু অভিভাবক হিসাবে আপনি আপনার শিশুকে কি সেই ইচ্ছে পূরণ করতে অনুপ্রেরণা দিবেন?

৮। সঙ্গীতশিল্পী বা গায়ক

তালিকায় ৮ নাম্বারে আছে ‘গায়ক’ হওয়ার ইচ্ছে। জিজ্ঞেস করুন তো আপনার শিশুকে তার ইচ্ছে কি বড় হয়ে গায়ক হওয়ার।

৭। আর্মি বা সামরিক অফিসার

বেশ ইন্টারেস্টিং ব্যাপারটা। শিশুরা আর্মিতে যেতে চায় এই অল্প বয়সেই। আপনার শিশুর স্বপ্ন যদি থাকে আর্মি অফিসার হওয়ার তাহলে তাকে বলুন যে আর্মি অফিসার হতে হলে তাকে কি কি করতে হবে। সময়মতো খেতে হবে (বিশেষ করে সবজি)। তাহলে শরীরে শক্তি হবে। আর মনোযোগ দিয়ে পড়তে হবে এবং নিয়মিত Excercise করতে হবে।

৬। Law Enforcement (পুলিশ বা র‍্যাব)

আর্মি অফিসারের মতই এই দিকেও শিশুদের অনেক আগ্রহ। কেন হতে চাও পুলিশ, জিজ্ঞেস করলে বলবে, ‘আমি সব অপরাধীদের ধরে জেলে দিয়ে দিবো। তাহলে সবাই অনেক সুখে থাকবে।’ আপনার শিশু যদি পুলিশ, র‍্যাব বা গোয়েন্দা হতে চায় তাহলে তাকে একইভাবে বুঝিয়ে বলুন যে এর জন্য দরকার শক্তি, বুদ্ধি এবং মেধা। তাই তাকে নিয়মিত খেতে হবে, ব্যায়াম বা খেলাধুলা করতে হবে, বুদ্ধি বাড়াতে বই পড়তে হবে বা বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের খেলা খেলতে হবে। এগুলো ঠিকমতো করলে সে বড় হয়ে পুলিশ অফিসার বা গোয়েন্দা হতে পারবে।

৫। বিজ্ঞানী

তালিকার ৫ নাম্বারে আছে শিশুদের ‘বিজ্ঞানী’ হওয়ার স্বপ্ন। আমরা আগেও বিভিন্ন সময় জরিপে দেখেছি শিশুদের মধ্যে বিজ্ঞানী হওয়ার ইচ্ছে প্রবল। শিশুরা নিজেরা যেহেতু খুব ক্রিয়েটিভ, আর বিজ্ঞানীরাও কত নতুন সব জিনিস আবিষ্কার করে, তাই শিশুদের মধ্যে এই ইচ্ছেটা প্রবল। আপনার শিশু যদি বিজ্ঞানী হতে চায়, তাহলে বুঝবেন তার মধ্যে কৌতুহল খুব প্রবল, সব কিছু নিয়েই তার অনেক প্রশ্ন, নতুন যেকোনো জিনিস সে খুলে-ভেঙ্গে দেখতে চাবে। তাকে আরও উৎসাহ দিন এবং সাহায্য করুন।

বিজ্ঞানী আর ইঞ্জিনিয়ার কিন্তু এক জিনিস নয়। বিজ্ঞানী আরও অনেক বড় স্বপ্ন। বাংলাদেশের একটি শিশুর জন্য আরও বড়। তার স্বপ্নকে সামনে এগিয়ে নিতে আপনি তার আগ্রহের জায়গাগুলো নিয়ে আরও কাজ করুন। তাকে বিভিন্ন বিজ্ঞানীদের কথা পড়ে শুনান। যে ব্যাপারটি নিয়ে তার আগ্রহ, সেটি নিয়ে সে যেন আরও শিখতে পারে, নিজে নিজে কাজ করতে পারে তার জন্য তাকে সাহায্য করুন।

৪। ইঞ্জিনিয়ার

শিশুদের মধ্যে পপুলারিটির তালিকায় ৪ নাম্বারে আছে ইঞ্জিনিয়ার। আপনার শিশু কি ইঞ্জিনিয়ার হতে চায়? তাহলে তার মধ্যে যেকোনো নতুন জিনিস খুলে বা ভেঙ্গে দেখার স্বভাব প্রবল থাকার কথা। নতুন খেলনা কিনে দেয়ার ২ দিনের মধ্যে যদি দেখেন সেটি ভেঙ্গে ফেলেছে, তাহলে বকা না দিয়ে তাকে বলুন, ‘চল, আমরা এটিকে জোড়া দেই।’ আর তাকে বলুন ইঞ্জিনিয়ার হতে হলে কিন্তু অংক এবং বিজ্ঞান বিষয়ে খুব ভালো দক্ষতা থাকতে হবে। তাই পড়াশুনাটাও মনোযোগ দিয়ে করতে হবে।

৩। পাইলট

সেরা ৩ এ আছে পাইলট হওয়ার স্বপ্ন। পাখির মতো আকাশে উড়তে পারার স্বপ্নকেই হয়তো বাস্তবে রূপ দিতে শিশুদের এই পাইলট হওয়ার আকাঙ্ক্ষা। আপনার শিশুও হয়তো পাইলট হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। জিজ্ঞেস করুন বড় হয়ে সে কি হওয়ার স্বপ্ন দেখে। যদি হয় সেটা পাইলট, তাহলে তাকে জিজ্ঞেস করুন যে পাইলট হতে হলে কি করতে হবে সেটা কি সে জানে? খুবই স্বাভাবিক যে সে জানবে না। পাইলট হতে হলে পাইলট হওয়ার স্কুলে বা Airforce এ তাকে যেতে হবে শিখতে সেটি তাকে বলুন। সেখানে ভর্তি হতে লাগে বিজ্ঞান এবং অংকের ভালো দক্ষতা, ভালো চোখের দৃষ্টি এবং সুস্থ শরীর। তার মানে তাকে নিয়মিত সবজি এবং দুধ খেতে হবে, ব্যায়াম করতে হবে। বিজ্ঞান এবং গনিতে দক্ষ হতে হবে। সেটি তাকে বলুন। পাশাপাশি কিভাবে বিমান কাজ করে, বিমান কিভাবে বানায় ইত্যাদি নিয়ে তাকে আগ্রহী করে তুলতে সাহায্য করুন। ইউটিউব থেকে কিছুটা ঘাঁটাঘাঁটি করে নিজেও সেগুলো জেনে নিতে পারেন।

২। শিক্ষক 

শিশুরা ছোটবেলায় তাদের অভিভাবক এবং শিক্ষকদের খুব কাছাকাছি থাকে। অনেক শিশুই আছে যারা বড় হয়ে তাদের শিক্ষকের মতো নিজেও শিক্ষক হতে চায়। একজন ভালো শিক্ষক হতে হলে তাকেও যে পড়াশুনায় ভালো হতে হবে সেটি বুঝিয়ে বলুন। কারণ সে যদি নিজে সেগুলো ভালমত না বুঝে তাহলে তার ছাত্রছাত্রীদের বুঝাবে কিভাবে?

আপনি যদি মনে করেন আমাদের দেশে প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক হয়ে তো আসলে কোন লাভ নেই, তাহলে আপনি ভুলভাবে চিন্তা করছেন। আপনার শিশু বড় হয়ে কি হতে চায় সেটি হয়তো আজকে থেকে কয়েকবছর পরেই পাল্টে যাবে। কিন্তু আজকে এখন যদি আপনি আপনার শিশুর স্বপ্নকে বাধা দেন এবং তাকে বলেন যে, না শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখা ভুল, তাহলে আপনি তার মানসিক বিকাশের ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা দিচ্ছেন। মূল বিষয়টি হচ্ছে অভিভাবক হিসাবে আপনি আপনার শিশুর পূরণে কতটা সাহায্য করছেন।

আরেকটা গোপন কথা হচ্ছে, আজকে থেকে ১৫-২০ বছর পর যখন আসলেই আপনার শিশু স্কুল শিক্ষক হতে চাবে ততদিনে স্কুল শিক্ষকদের বর্তমান অবস্থা আর থাকবে না আমাদের দেশে। আগামী ২০ বছরের মধ্যে শিক্ষকতা পেশার ইনকাম ইঞ্জিনিয়ার থেকেও অনেক বেশি হবে। তাই সেদিক থেকে আপনি নিশ্চিত থাকতে পারবেন।

১। ডাক্তার

বাংলাদেশের শিশুদের মধ্যে সবচেয়ে পপুলার পেশা হচ্ছে ডাক্তার। কিন্তু আসলে কতটা পপুলার সেটি জানলে আরও অবাক হবেন। ৪০ ভাগের বেশি শিশু বলেছে তারা বড় হয়ে ডাক্তার হতে চায়। এবং কারণ হিসাবে তারা বলে যে তারা ডাক্তার হয়ে সবাইকে সাহায্য করতে চায়। যেহেতু শিশুরা ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন দেখে অন্যকে সাহায্য করতে, তাই স্বাভাবিকভাবেই অনেকে ডাক্তার হয়ে সাহায্য করতে চায়। পাশাপাশি অভিভাবকের একটা influence হয়তো থাকে অথবা পরিবারে কেউ হয়তো ডাক্তার আছে।

কিন্তু আসল কথা হচ্ছে যে, আমাদের দেশে শিশুদের মধ্যে বড় হয়ে ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন সবচেয়ে বেশি। এখন তাহলে আপনি ভাবুন তো আপনার শিশুর ডাক্তার হওয়ার স্বপ্নকে সত্যি করতে আপনি কিভাবে সাহায্য করতে পারেন? কিভাবে তাকে নিয়ে একটি পরিকল্পনা করতে পারেন এবং ধাপে ধাপে সেগুলো বাস্তবায়নে সাহায্য করতে পারেন?

আপনার শিশুর ভবিষ্যৎ দক্ষতা 

আপনার শিশু বড় হয়ে যা কিছু হওয়ার স্বপ্ন দেখুক না কেন কয়েকটি কমন দক্ষতা তার অর্জন করতে হবে এখন থেকেই। কেবল পড়াশুনায় ভালো ফলাফল করেই সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। ভবিষ্যতের পৃথিবীতে আপনার শিশু যে পেশাতেই যেতে যাবে তার জন্য তার এই দক্ষতাগুলো এখন থেকেই অর্জন করতে হবে – সেগুলো হলঃ সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা, Analytical Skill, Emotional Intelligence ইত্যাদি।

এই দক্ষতাগুলো বাড়ানো নিয়ে কাজ করছে আমাদের Kids Time. আপনার নিশ্চয়ই জানতে ইচ্ছে করছে আপনার শিশুর মধ্যে এই দক্ষতা কতটুকু আছে? শিশুদের জন্য আগামী ২৩-২৪ নভেম্বর আমরা আয়োজন করছি Kids Time Fair যেখানে শিশুরা বিভিন্ন ক্রিয়েটিভ কাজ করার সুযোগ পাবে। পাশাপাশি অভিভাবকদের জন্যও রয়েছে বিভিন্ন আয়োজন।

আগ্রহী অভিভাবকরা বিস্তারিত দেখতে পারেন এই লিঙ্কে গিয়ে।

নিচের ছবিতে ক্লিক করে চলে যান সরাসরি।

মেলায় অংশ নিতে আগ্রহী অভিভাবকরা সরাসরি রেজিস্ট্রেশন করতে পারেন এই লিঙ্কেঃ 

রেজিস্ট্রেশন লিঙ্ক 

……………………………………………………………………………………………

‘সিসিমপুর মেলাটি’ আয়োজন করা হয়েছিলো ‘ইচ্ছে জমা করি’ প্রকল্পের আওতায়। Sesame Workshop Bangladesh এবং Light of Hope ঢাকার ৫০ টি স্কুলে শিশুদের স্বপ্ন দেখা, তার জন্য পরিকল্পনা করা, সেগুলো ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা এবং তার জন্য সঞ্চয় করার উৎসাহ দিতে এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্পটি অর্থায়ন করছে মেটলাইফ ফাউন্ডেশন।