একটি স্কুলকে বদলে দিতে শিক্ষকদের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। কিন্তু স্কুলের উন্নয়নে শিশুরা নিজেরা কি কিছু করতে পারে না? শিশুরা যদি নিজেরা নিজেদের স্কুলের উন্নয়নের জন্য দায়িত্ব পায় তাহলে তারা কি ধরণের কাজ করবে? এতে করে তাদের মধ্যে লিডারশীপ স্কিল, পরিকল্পনা করা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা কি বাড়বে না?

১০-১৪ বছর বয়সী শিশুরা কি এমন দায়িত্ব পালন করতে পারবে? নিজেদের দক্ষতার উন্নয়নের পাশাপাশি স্কুলের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজগুলো তারা কতটা সফলতার সাথে করতে পারবে?

এমনই একটি চিন্তা থেকে পরীক্ষামূলকভাবে আমরা শুরু করেছিলাম ‘Sisimpur Kid Ambassador’ কনসেপ্টটি। 

সিসিমপুর শিশু প্রতিনিধিরা নিজেদের কাজগুলো প্রদর্শন করছে সিসিমপুর মেলায়।

গত ৮ মাস ধরে ঢাকার মোট ৫০টি স্কুলে Light of Hope বাস্তবায়ন করছে সিসিমপুরের ‘ইচ্ছে জমা করিঃ পরিবারের আর্থিক ক্ষমতায়ন গড়ি’ প্রকল্প। প্রকল্পটি অর্থায়ন করেছে মেটলাইফ ফাউন্ডেশন। প্রকল্পের আওতায় প্রতি স্কুল থেকে ৪ জন করে Sisimpur Kid Ambassador (যাদের বয়স ১০-১৪ বছর) নির্বাচন করা হয়েছে। যাদের দায়িত্ব ছিল তাদের নিজ নিজ স্কুল নিয়ে তাদের স্বপ্ন এবং সমস্যা চিহ্নিতকরণ এবং সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে সেগুলো ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা। এ জন্য তাদের দুই ধাপে প্রশিক্ষণ করায় Light of Hope. কিভাবে একটি নতুন উদ্যোগ নিতে হবে, কিভাবে তার জন্য ধাপে ধাপে পরিকল্পনা করতে হবে, কিভাবে সবাইকে সংযুক্ত করতে হবে, কিভাবে অর্থায়ন করতে হবে সেই পরিকল্পনাটি – এরকম আরও বিষয়গুলো এসেছে প্রশিক্ষণে।

International Charity Day তে Kid Ambassador রা নিজেদের স্কুলে পুরাতন বই এবং খেলনা সংগ্রহ করে পৌঁছে দিয়েছে সুবিধাবঞ্চিত স্কুলের কাছে।

আমাদের অবাক করে দিয়ে এখন পর্যন্ত ৫০ টি স্কুলের প্রায় ৬০০ জন শিক্ষার্থী মিলে মোট ১৮৮ টি পরিকল্পনা করেছে এবং মাত্র কয়েকমাসে তারা ১৮৪টি পরিকল্পনা সফলভাবে বাস্তবায়ন করেছে। এইসকল শিক্ষার্থীরা ৪র্থ থেকে ৭ম শ্রেণী পড়ুয়া। মাত্র ৩ মাসের মাঝে স্কুলে এতোগুলো পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে ফেলা আসলেই বিশাল একটা ব্যাপার।

Jeff Dunn, President & CEO, Sesame Workshop is observing the Sisimpur Library

এইবার আসুন জেনে নেই কি কি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছে তারা স্কুলগুলোতে। যে কাজটি প্রত্যেকটা স্কুলেই হয়েছে সেটা হল প্রকল্পের আওতায় প্রতিটি স্কুলে একটি করে সিসিমপুর লাইব্রেরি কর্নার। Sisimpur Kid Ambassador রা লাইব্রেরির জন্য নতুন নতুন গল্পের বই সংগ্রহ করেছে এবং অনেকে আবার লাইব্রেরি রুমটাকে বর্ধিত করেছে।

তাছাড়া আরো ছিল পুরনো জিনিস ব্যবহার করে লস্ট এন্ড ফাউন্ড বক্স, দান এবং শেয়ারিং বাক্স, অভিযোগ বাক্স এবং বিভিন্ন ধরনের ক্র্যাফট আইটেম। আরো একটি কাজ অনেক স্কুলেই হয়েছে- সেটি হল বাগান করা। যাদের স্কুলে জায়গা আছে তারা মাটিতে গাছ লাগিয়েছে, যাদের নেই তারা প্লাস্টিকের বক্স দিয়ে টব বানিয়ে গাছ লাগিয়েছে। তাছাড়া প্রায় প্রত্যেকটি স্কুল তাদের স্কুল এবং ক্লাসরুমের ভিতরের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য প্রচুর ছবি একে দেয়ালে লাগিয়েছে। আরেকটি স্কুলে তারা ‘ফার্স্ট এইড কিট বক্স’ বানিয়েছে পুরনো বক্স দিয়ে এবং স্কুলে সবার কাছ থেকে চাঁদা তুলে সকল মেডিসিন আইটেম কিনেছে।

ছোট ক্লাসের শিশুরা প্রায়ই তাদের পেন্সিল কলম ফেলে যায় ভুলে, পরে এসে আর খুঁজে পায় না। তাই Kid Ambassador রা প্রতি ক্লাসের জন্য তৈরি করেছে ‘Lost & Found Box’.

 

তো এইখানে কিছু লক্ষনীয় বিষয় আছে। প্রথমত, প্রকল্পের আওতায় ট্রেইনিং পেয়েছে প্রতি স্কুলের ৪ জন করে। তারা তারপর ওদের আরো ৮ জন বন্ধুকে বাছাই দলে নিয়েছে। তার মানে মোট ৬০০ জন শিক্ষার্থী এই সকল পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করেছে। এরা যে কোনো কাজের জন্য অথবা টাকার জন্য স্কুলের সকলের কাছেই গিয়েছে। যারা স্কুলের এইসকল উন্নয়নমুলক কাজের জন্য টাকা দিয়েছে তারা কিন্তু সেটা বাসা থেকে চেয়ে আনেনি, টিফিনের টাকা জমিয়ে দিয়েছে।

স্কুলের অনেক বাচ্চাই ছবি এঁকেছে স্কুলের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য, অনেক বাচ্চাই তাদের পুরনো গল্পের বই দিয়েছে লাইব্রেরীর জন্য, তাদের পুরনো খেলনাও দিয়েছে যাতে এটা যার দরকার তাকে পৌছে দেয়া যায়। এছাড়া স্কুলের শিক্ষক এবং অভিভাবকরা তো পাশে ছিলেনই। তারমানে একটি স্কুলে যখন কাজ হয় সেটাতে স্কুলের সকলের কোনও না কোনভাবে অংশগ্রহণ ছিলই। এর মাধ্যমে স্কুলের সকল শিশুই এই বয়সে একটা সুন্দর অভিজ্ঞতা পাচ্ছে যা তার জীবনের যে কোনো পর্যায়ে কোনো না কোনো ভাবে কাজে লাগবে।

Sisimpur Kid Ambassador রা নিজেদের স্কুলে সংগ্রহ করা বই এবং খেলনা পৌঁছে দিচ্ছে অন্য একটি স্কুলে, সাথে আছেন শিক্ষকরা।

 

আরো একটি বিষয় হচ্ছে, এই যে ৫০ টি স্কুলে এই লীডারশিপ জার্নি শুরু হল সেটা চলমান থাকবে। কারণ আমরা এটাও শিখিয়ে দিয়েছি কিভাবে পরবর্তী দলের সদস্য বাছাই করে তাদেরকেও এর সাথে সংযুক্ত করা যায়। যেন এখন যে দলটি কাজ করছে তারা চলে গেলে পরবর্তী ছোট ক্লাসের সদস্যরা যেন নতুন নতুন পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন করতে পারে।

নিজেদের স্কুলের লাইব্রেরি রুম সাজাচ্ছে Sisimpur Kid Ambassador রা।

আসুন এবার দেখে নেই স্কুলের কিছু সেরা সেরা কাজঃ

১। লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠাঃ অব্যবহার্য এবং প্রায় অন্ধকার একটি রুমকে বই দিয়ে সাজিয়ে আলোকিত করেছে মিরপুর বাংলা গার্লস স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেনীর সিসিমপুরের Kid Ambassador রা।

সিসিমপুর লাইব্রেরি যদি আপনার স্কুলে বা আপনার শিশুর স্কুলে করতে চান, তাহলে এখনই নিচের ছবিতে ক্লিক করে আবেদন করে ফেলুন। আপনার শিশুর স্কুলের শিক্ষককে বলুন। আর আপনি নিজে যদি শিক্ষক হন, তাহলে প্রধান শিক্ষককে জানান এখনই। 

২। বাগান করাঃ মনেশ্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের Sisimpur Kid Ambassador রা স্কুলের ব্যালকনীতে প্লাস্টিকের বোতলে গাছ লাগিয়ে সাজিয়েছে একটি পুরো ঝুলন্ত বাগান। তাছাড়া স্কুলের নিচে আশেপাশে গাছ লাগিয়ে তারা পুরো স্কুলটাকে সবুজে ভরিয়ে দিয়েছে।

৩। স্কুল সৌন্দর্যবর্ধনঃ আহসানিয়া মিশনে স্কুলের Sisimpur Kid Ambassaor রা তাদের স্কুলে করেছে এইসকল কাজ। এই কাজের স্কুলের অনেক শিক্ষার্থী ছবি এঁকে জমা দিয়েছে। এখন তারা স্কুলে তাদের হাতে ছবি দেয়ালে ঝুলানো দেখে অনেক আনন্দ পায়।

৪। ক্র্যাফটঃ চেরী ব্লোসমস ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের সিসিমপুর কিড এম্বাসেডররা যেই কাজটি সবচেয়ে বেশী করেছে সেটা হল তারা প্রচুর ক্র্যাফটের কাজ করেছে। পুরো স্কুল জুড়ে এখন অনেক ধরনের সুন্দর সুন্দর ক্র্যাফট আইটেম।

৫। লস্ট এন্ড ফাউন্ড বক্সঃ চেরী ব্লোসমস ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের সিসিমপুর কিড এম্বাসেডররা অনেক সুন্দর সুন্দর লস্ট এন্ড ফাউন্ড বক্স বানিয়েছে। এখন আর কারো জিনিস হারিয়ে যায় না। সবাই এইখানে তাদের ফেলে যাওয়া জিনিস খুঁজে পায়।

৬। ফার্স্ট এইড কিট বক্সঃ বঙ্গবন্ধু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সিসিমপুর কিড এম্বাসেডররা নিজ উদ্যোগে তৈরি করেছে এই স্বল্প দামের ফার্স্ট এইড কিট বক্স। স্কুলের সকলের অবদান আছে এটার জন্য টাকা দান করে।

লিডারশীপ গুণ, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা, সৃজনশীলতা এবং অপরকে সহায়তা করার মনোভাব – এই বিষয়গুলো যদি আমরা শিশুদের মধ্যে স্কুল পর্যায় থেকেই তাদের মধ্যে দিতে পারি তাহলে এরাই একদিন বড় হয়ে দেশের হাল ধরবে। নিজেদের জীবনে উন্নতির পাশাপাশি সমাজের এবং দেশের উন্নয়নের জন্য কাজ করার মতো দক্ষ হয়ে উঠবে।

এই প্রকল্পের আওতায় ৬০০ জন শিশুর কেউ হয়তো বড় হয়ে হবে ডাক্তার, কেউ বা ইঞ্জিনিয়ার, কেউ লেখক, শিক্ষক, সাংবাদিক কিংবা রাজনীতিবিদ। কিন্তু গত ৮ মাসে লিডারশীপের যে বীজ তাদের মনে বপন হয়েছে সেটিই হয়তো তাদেরকে সাহায্য করবে লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলতে। ১৫-২০ বছর পরেই আমরা তার উত্তর পাবো।

……………………………………………………………………………………

 

আপনার শিশুর সৃজনশীলতা বাড়াতে Kids Time মেলা 

শিশুদের সৃজনশীলতাকে এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতাকে মাথায় রেখে সাজানো হয়েছে আমাদের Kids Time মেলার থিম। নভেম্বরের ২৩-২৪ (শুক্র-শনি) তারিখে বাংলাদেশ শিশু একাডেমীতে হচ্ছে আমাদের এই মেলা। বিস্তারিত জানতে নিচে পড়ুন।

শিশুদের পাশাপাশি অভিভাবকদের জন্যও থাকছে শেখার এবং অংশ নেয়ার জন্য আলাদা বুথ।

আগ্রহী অভিভাবকদের রেজিস্ট্রেশন করতে হবে নিচের লেখায় ক্লিক করে।

রেজিস্ট্রেশন লিঙ্ক

Kids Time Fair নিয়ে বিস্তারিত খুব চমৎকারভাবে লেখা হয়েছে আমাদের একটি আর্টিকেলে। নিচের ছবিতে ক্লিক করেই সেটি পড়তে পারবেন।

Kids Time মেলা সম্পর্কে জানতে ছবিতে ক্লিক করুন।

অভিভাবকরা যেন বাচ্চাদের জন্য অপেক্ষার সময়টাকে নিজেদের জন্য কাজে লাগাতে পারেন সেজন্য Teachers Time আসবে Parenting Course এর উপর অনেক কিছু নিয়ে। আপনি চাইলে আমাদের শিশু বিশেষজ্ঞের সাথে আপনার সন্তানের বিষয়ে কথা বলে পরামর্শ নিতে পারেন।

মেলা সম্পর্কে আরো বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন নিচের Facebook Event লিঙ্কেঃ  https://www.facebook.com/events/274479596530846/

Registration Link