ঢাকা শহরে শিশুদের জন্য বিনোদনের মাধ্যম খুবই কম। আর শুধুমাত্র শিশুদের জন্য কোনো ইভেন্ট আয়োজন তো প্রায় একেবারে নেই বললেই চলে। অভিভাবকরা মুখিয়ে থাকেন কখন শিশুদের কোনো একটি ইভেন্ট হবে আর তার বাচ্চাটিকে নিয়ে সেখানে যাবেন চমৎকার একটি দিন কাটানোর জন্য। আর ইভেন্টটি যদি হয় বাচ্চার জন্য শিক্ষনীয় তাহলে তো কথাই নেই।

এরকমই একটি উপলক্ষ তৈরি হয়েছিলো গত অক্টোবর মাসের  ১৯-২০ তারিখে বাংলাদেশ শিশু একাডেমীর প্রাঙ্গণে ‘সিসিমপুর মেলায়’। মেলাতে প্রায় ৯০০০ শিশু এবং সাথে তাদের অভিভাবকদের মিলিয়ে দুইদিনে ১৬০০০ এর বেশি মানুষ এসেছিল। মেলায় আসার জন্য কেবল অনলাইনেই রেজিস্ট্রেশন হয়েছিলো প্রায় ১৪,০০০ শিশুর।

গত আট মাস ধরে Light of Hope সিসিমপুরের ‘ইচ্ছে জমা করিঃ পরিবারের আর্থিক ক্ষমতায়ন গড়ি’ প্রকল্প নিয়ে কাজ করছে ঢাকার ৫০ টি স্কুলে। এই প্রকল্পের অংশ হিসেবে Light of Hope বাংলাদেশ শিশু একাডেমিতে আয়োজন করেছিল দুইদিনব্যাপী শিশুদের জন্য মেলা।

এই মেলাটি মুলত ছিল সিসিমপুরের ‘ইচ্ছে জমা করি’ প্রকল্পের একটি অংশ। প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে ৩-৮ বছর বয়সী বাচ্চাদের মাঝে স্বপ্ন দেখার বীজ বুনে দেয়া এবং সেই স্বপ্ন কিভাবে নিজেরাই বাস্তবায়ন করতে পারে সেই কৌশল শিখিয়ে দেয়া। তাছাড়া কেনাকাটার সময় তার কোনটি দরকার আর কোনটি শুধুই চাহিদা সেটা বুঝতে পারা, যেই জিনিস তার আর প্রয়োজন নেই বা পুরনো হয়ে গেছে সেটি চাইলে তার বন্ধু বা যা প্রয়োজন এমন শিশুর সাথে শেয়ার করা যায় – এই বিষয়টি বুঝতে পারা। এছাড়া স্বপ্ন পুরণের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সঞ্চয় করতে শুরু করা। তাছাড়া আরো ছিল কিভাবে পুরনো জিনিসকে ফেলে না দিয়ে নতুন করে ব্যাবহার করা যায়।

আমাদের এই মেলাটি এমনভাবেই সাজানো হয়েছিল যাতে মেলাতে এসে প্রতিটি শিশু এই বিষয়গুলো নিয়ে একটা ধারণা পেতে পারে এবং নিজের জীবনে কাজে লাগাতে পারে। পুরো মেলাটি হয়েছিল বাংলাদেশ শিশু একাডেমীর সম্পুর্ন প্রাঙ্গণজুড়ে যেখানে সাজানো হয়েছিল শিশুদের জন্য বিভিন্ন বুথ। পুরো মেলা ‘ইচ্ছে’; ‘জমা’ এবং ‘করি’ এই তিনভাগে ভাগ করা হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল ধাপে ধাপে বাচ্চারা তাদের ইচ্ছেপুরনের ধাপগুলো শিখতে পারবে। চলুন জেনে নেই কোন ধাপে কি কি ছিল শিশুদের জন্য।

প্রথমে ঢুকেই শিশুরা তাদের স্বপ্নের কথা জানান দিয়েছে ‘ইচ্ছে গাছে’। শিশুরা একটি করে পাতায় লিখেছে সে বড় হয়ে কি হতে চায়। এরপর ছিল একটি ছোট ইচ্ছে গাছ। এই গাছেও অনেক পাতা আছে। এবার পালা বাচ্চার সাথে অভিভাবকরাও লিখবে বাচ্চাকে নিয়ে তাদের স্বপ্ন, পরিবারকে নিয়ে স্বপ্ন আর বাচ্চা তার নিজের আরো স্বপ্নগুলো লিখতে পারে। এরপর রয়েছে পরিকল্পনা ছক। এখানে বাচ্চা শিখেছে যেকোনো স্বপ্ন বাস্তাবায়ন করতে কিভাবে ধাপে ধাপে কাজ করা লাগে সেটা।

এরপর ছিল ‘এসো বই পড়ি আর শিখি’ নামক বুথ। এখানে শিশুরা নিজেরা বা তাদের অভিভাবকদের সাথে বসে অনেক মজার মজার গল্পের বই পড়েছে। এরপর বাচ্চারা দেখেছে এই প্রকল্পের শিক্ষণীয় বিষয়গুলি নিয়ে যত ভিডিও কন্টেন্ট আছে সেগুলো। আমরা মেলাতে ‘নগরকৃষি’ নামক একটি প্রতিষ্ঠানকে আমন্ত্রন করেছিলাম শিশুদের গাছ সম্পর্কে জানানোর জন্য। তারা শিখিয়েছে কিভাবে গাছ লাগাতে হয়, কিভাবে নিজে নিজেই প্রাকৃতিক উপায়ে সার বানাতে হয় এবং কিভাবে গাছের ক্ষতিকর এবং উপকারী পোকা চিনতে হয়।

এরপর ছিল ‘ইচ্ছে জমা করি’ প্রকল্পের সেরা ৫টি স্কুলের ৪র্থ থেকে ৭ম শ্রেনী পর্যন্ত ‘সিসিমপুর শিশু প্রতিনিধিদের’ নিজ নিজ স্কুলের কর্মকান্ড প্রদর্শনী। আমরা একটি ব্যাংককে আমন্ত্রন করেছিলাম যারা কিনা বাচ্চাদের জন্য Student Banking Concept টা নিয়ে হাজির হয়েছিল এবং মেলার দিনেই অনেক অনেক অভিভাবক তাদের শিশুদের জন্য একাউন্টও খুলেছে।

মেলায় ঢোকার প্রবেশপথের বাম দিকের পুরোটা জুড়ে ছিল শিশুদের সরাসরি অংশগ্রহণে বিভিন্ন Activity. মেলার দুইদিন জুড়ে এই অংশেই বাচ্চা এবং অভিভাবকদের ভীড় সবচেয়ে বেশী ছিল। তো এই অংশে প্রথমে ছিল Creative Design and Art. বাচ্চারা ইচ্ছেমত বিভিন্ন ডুডলে রঙ করেছে। এরপর ছিল Crafting. বাচ্চারা প্লাস্টিকের বোতল, রঙ্গিন কাগজ, কাচি আর আঠা নিয়ে বসে পরেছিল নতুন কিছু বানানোর জন্য। এই দুটি কাজ করতে বাচ্চারা একটুও ক্লান্তি বোধ করেনি।

‘আঁকি আমার সিসিমপুর’ বুথে শিশুরা এঁকেছে তাদের ভালোবাসার সিসিমপুর এবং বিভিন্ন চরিত্রকে।

আর মেলাতে শিশুরা এত কিছু শিখলো, সেটার জন্য আমরা একটা কুইজেরও আয়োজন করেছিলাম। বিজয়ীদেরকে পুরষ্কৃত করা হয়েছে স্টেজে।

ও হ্যাঁ। আরো এসেছিল সিসিমপুরের হালুম, টুকটুকিরা। ওরাও মেলার এক ফাঁকে মাতিয়ে রেখেছিল পুরো প্রাঙ্গনকে।

তাছাড়া মেলাতে ছিল Light of Hope এবং Sisimpur এর দুইটি বুথ যেখানে সকল শিশুতোষ গল্পের বই প্রদর্শনী হয়েছিল। অভিভাবকরা চাইলে এখান থেকে বই কিনে নিয়ে যেতে পারেন। এইখানে আসলে বর্তমানের সকল শিশুতোষ বইয়ের একক সমাহার।

‘ইচ্ছে জমা করি’ প্রকল্পের ৫০ টি স্কুলের মধ্যে সেরা স্কুল, সেরা প্রধান শিক্ষক, সেরা শিক্ষক প্রতিনিধি, সেরা ‘সিসিমপুর শিশু প্রতিনিধি’ ইত্যাদি ক্যাটাগরিতে পুরষ্কার দেয়া হয়।

মেলার উদ্বোধনে এবং বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে উপস্থিত ছিলেন সিসেমি ওয়ার্কশপ বাংলাদেশ, মেটলাইফ ফাউন্ডেশন, লাইট অফ হোপ এবং শিশু একাডেমীর প্রতিনিধিবৃন্দ।

 

সিসিমপুরের পরবর্তী মেলায় যোগ দিতে যুক্ত থাকুন সিসিমপুর ফেসবুক পেজে এবং আপনার শিশুকে নিয়ে সিসিমপুরের বিভিন্ন মজার ভিডিও দেখুন সিসিমপুরের ইউটিউব চ্যানেলে

সিসিমপুর লাইব্রেরি যদি আপনার স্কুলে বা আপনার শিশুর স্কুলে করতে চান, তাহলে এখনই নিচের ছবিতে ক্লিক করে আবেদন করে ফেলুন। আপনার শিশুর স্কুলের শিক্ষককে বলুন। আর আপনি নিজে যদি শিক্ষক হন, তাহলে প্রধান শিক্ষককে জানান এখনই। 

……………………………………………………………………………………………………………………