একটা স্কুল কি কেবল শিশুদের পড়াশুনাই করাবে? নাকি শিশুর মানসিক দক্ষতা এবং ভবিষ্যতের জন্য তাকে তৈরি করাও স্কুলের দায়িত্বের মধ্যে পড়বে?

কেমন হয় যদি স্কুল থেকেই শিশুরা জানতে পারে কিভাবে স্বপ্ন দেখতে হয়, ইচ্ছে বা স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য পরিকল্পনা করতে হয়, এরপর কিভাবে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হয়? কেমন হয় যদি শিশুরা স্কুল থেকেই শিখতে পারে নিজেকে আত্মনিয়ন্ত্রণ করার কৌশল, ‘চাওয়া’ এবং ‘দরকারের’ মধ্যে পার্থক্য, কিভাবে অন্যকে সাহায্য করতে হয়, সঞ্চয় করতে হয়?

স্কুল যদি শিশুকে তৈরি করে আত্মবিশ্বাসী হিসাবে, তাদের মধ্যে তৈরি করে নেতৃত্বদান করার দক্ষতা এবং গড়ে তুলে মানবিক গুণাবলি?

Metlife ফাউন্ডেশনের আর্থিক সহযোগিতায় ঢাকার ৫০ টি স্কুলে চলছে সিসিমপুরের ‘ইচ্ছে জমা করিঃ পরিবারের আর্থিক ক্ষমতায়ন গড়ি’ প্রকল্প যা লাইট অফ হোপ বাস্তবায়ন করছে। এই ৫০ টি স্কুলের ১৬ হাজার শিশু এবং ৮ হাজার অভিভাবককে সাথে নিয়ে উপরে উল্লেখ করা ‘স্বপ্নগুলোই’ বাস্তবায়নের কাজ চলছে গত ৮ মাস ধরে। এমনই একটি স্কুলের পরিবর্তনের গল্প শুনবো আজ আমরা।

চেরী ব্লোসমস ইন্ট্যারন্যাশনাল স্কুল এন্ড কলেজ – মিরপুরের একটি স্কুল। তাদের গত ৮ মাসের পরিবর্তনের মুলে ছিলেন তাদের স্কুলের প্রিন্সিপাল। এই প্রকল্প নিয়ে তার আগ্রহ ছিল সবচেয়ে বেশী। এমনিতে তিনি স্কুলের সহশিক্ষা কার্যক্রম নিয়ে ব্যাপক কাজ করছেন। তিনি এই প্রকল্পের সকল কার্যক্রম নিজে মনিটর করেছেন। স্কুলের শিক্ষক এবং Sisimpur Kid Ambassador রা এই কাজে অনেক সময় এবং শ্রম দিয়েছেন। আর অভিভাবকরাও বাচ্চাদেরকে এই কাজের জন্য অনেক অনুপ্রেরনা জুগিয়েছে।

Cherry Blossoms Int’l School & College এর পুরো দল এবং সাথে সিসিমপুর ও লাইট অফ হোপের সদস্যরা।

এই স্কুলের শিক্ষার্থীরা মিলে অনেক কিছু করেছে। যেমনঃ লস্ট এন্ড ফাউন্ড বক্স, নানা রকমের ক্র্যাফট, লাইব্রেরী, সিসিমপুরকে নিয়ে গান, সিসিমপুরের গল্পের বই থেকে অভিনয়, সিসিমপুরের গান নিয়ে নাচ ইত্যাদ। আর ছোট ছোট বাচ্চাদের মাঝে এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। চলুন আমরা পরিবর্তনের গল্পগুলো শুনি।

আমাদের প্রকল্পের একটা বড় উদ্দেশ্য ছিল যে শিশুরা নিজেদের স্বপ্নপুরনের জন্য টাকা জমানো শুরু করবে। শিশুদের সাথে সেশনে সিসিমপুরের বিভিন্ন ভিডিও দেখে শিখে এবং শিশুরা বাসায় বিভিন্ন কাজ করে, বাবা-মাকে কাজে হেল্প করে তার বিনিময়ে পকেট মানি পাচ্ছে। তারা বাসা গোছানোর কাজ করছে, মাকে রান্নাঘরে হেল্প করছে, কেউ আলুভর্তা করে দিচ্ছে ইত্যাদি। এর মাধ্যমে শিশুরা স্বাবলম্বী হওয়া শিখছে, নিজের কাজ নিজে করা শিখছে, দায়িত্ব নেয়া শিখছে। নিজের মধ্যে Self-satisfaction আসছে যে নিজের উপার্জনের টাকা দিয়ে সে ক্লাস পার্টি করছে, অন্যকে সাহায্য করছে, নিজের প্রয়োজনীয় জিনিস কিনছে।

আমাদের আয়োজন করা সেশনগুলো থেকে প্রতিটি শিশু শিখেছে অনেককিছু।

আরো একটি গুরুত্বপুর্ন শিক্ষনীয় বিষয় ছিল Need vs Want বোঝা। আগে বাচ্চারা প্রয়োজন না থাকলেও কিছু কিনত, কিন্তু প্রকল্পে শেখানো হয়েছে যেটা তোমার Priority সেটা তুমি কিনবে। এখন বাচ্চারা অপ্রয়োজনে টাকা খরচ না করে সেটা জমা করছে। যেটা দরকার সেটা কিনছে। চ্যারিটির জন্য শেয়ার করছে। চেরী ব্লোসমস এর প্রিন্সিপাল বলেন যে তিনি মার্কেটে গিয়ে তার ৭ বছর বয়সী নাতনীর জন্য একটি জামা পছন্দ করেছেন। কিন্তু তার নাতনী তখন বলে যে ‘This is my want, not need’.

Cherry Blossoms School এর শিশুরা সেশন উপভোগ করছে স্কুলে, সাথে আছেন Sesame Street এর CEO Jeff Dunn.

এছাড়া খাদ্য অভ্যাস নিয়েও বাচ্চাদের অনেক পরিবর্তন হয়েছে। আগে বাচ্চারা Junk Food এ আসক্ত ছিল। কিন্তু প্রকল্প অফিসার এসে যখন সেশনে দেখালো যে টুকটুকি সবজী খায়, হালুম মাছ খায়, তখন স্কুলে একটা বিপ্লব ঘটে গেল। এখন বাচ্চারা হালুমে টুকুটুকির কাছ থেকে Inspired হয়ে বাসায় মাছ সবজি খায়। বাসায় খাবার টেবিলে বসলে  তারা বাবা মাকে বলে যে আমাকে মাছ দাও, সবজী দাও। কারণ হালুম মাছ খায়। টুকটুকি সবজি খায়। স্কুলের ক্যান্টিনে এখন সিঙ্গারাতেও সবজি দেয়া হয়, এটা নাকি বাচ্চারা বলে করিয়েছে।

আগে স্কুলে কিছু হারিয়ে গেলে সেটা হয়ত স্কুল স্টাফরা পেলে খুজে দিত। কিন্তু অনেক সময় হারানো জিনিসটা খুজে পাওয়া যেত না। কিন্তু এখন ‘লস্ট এন্ড ফাউন্ড বক্স’ হওয়াতে বাচ্চারা কিছু পেলে সেটা সেখানে রেখে দেয়। পরের দিন এসে যে কিছু হারিয়ে ফেলেছে সেটা বক্সে খুজে পায়।

 

স্কুলের শিশুরা মিলে পুরাতন গল্পের বই এবং খেলনা সংগ্রহ করার জন্য campaign করেছে। সেখান থেকে যেসব খেলনা এবং বই পাওয়া গিয়েছে সেগুলো বাছাই করে প্যাকেট করেছে। এরপর স্কুলের শিক্ষকদের সহায়তায় পাশের আরেকটি স্কুলের শিশুদের সাথে শেয়ার করেছে। এভাবে তাদের মধ্যে অন্যর জন্য সহানুভূতি এবং সাহায্য করার অনুপ্রেরণা তৈরি হচ্ছে।

নিজেদের তৈরি করা ফান্ড দিয়ে নিজেরাই উদ্যোগ নিবে স্কুলের শিশুরা।

 

পাশাপাশি তারা দুটি স্কুল ফান্ড সৃষ্টি করেছে। একটি Donation Fund এবং একটি Class Party Fund. সেখানে শিশুরা নিয়মিত টাকা জমা করছে। Donation Fund এর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে এখানে টাকা জমিয়ে বছরে একবার তারা অন্য শিশুদের জন্য কিছু একটা করবে। সেটি হতে পারে তাদের জন্য বই কেনা, বা শীতের কাপড় কিনে দেয়া।

 

Jeff Dunn, President & CEO, Sesame Workshop is observing the Sisimpur Library

সিসিমপুর কর্নারে যেসকল বই দেয়া হয়েছে সেগুলো বাচ্চাদের Reading Habit বাড়াতে সাহায্য করছে। যেসব ছোট শিশুরা এখনও ঠিকমত পড়তে পারে না, তারা বইয়ের ছবি দেখে কন্টেন্ট বুঝে যাচ্ছে। অন্যান্য গেমসগুলোও শিশুদের কাছে অনেক আকর্ষনীয়। বইয়ের গল্প দেখে তারা নিজেরা Drama তৈরি করছে। এতে করে অন্য শিশুরাও যেমন তাদের কাছ থেকে শিখছে আর পাশাপাশি তাদের মনের বিকাশও ঘটছে।

স্কুলের শিশুরা মিলে সিসিমপুরের বই নিয়ে তৈরি করেছে ২ টি নাটক। সেই নাটক দল আবার অন্যদের পারফর্ম করে দেখায়।

আর সিসিমপুর কর্নারের রেজিস্টার Maintenance টা Kid Ambassador রাই করছে। আগে এটা শিক্ষকরা করত। কিন্তু এখন তাদের দায়িত্ব অনেক কমে গেছে। পাশাপাশি Kid Ambassador রা শিশুদের সাথে নিয়ে অন্য সব পরিকল্পনাগুলোও বাস্তবায়ন করছে। আর এই কাজগুলো করার মাধ্যমে তাদের মাঝে লীডারশীপ স্কিল, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা ইত্যাদি বৃদ্ধি পাচ্ছে। Kid Ambassador রা পরবর্তীতে অন্য শিশুদেরকে এই দায়িত্বগুলো বুঝিয়ে দিবে। এইভাবে এই প্রক্রিয়া চলমান থাকবে।

তাছাড়া প্রোজেক্ট থেকে স্কুলের যে দুজন শিক্ষককে ট্রেইন করা হয়েছে তারা স্কুলের অন্যান্য শিক্ষকদেরও ট্রেইন করেছে। অন্যান্য শিক্ষকরা তাদের নিজেদের ক্লাসের বাচ্চাদেরও প্রকল্পের সকল বিষয় নিয়ে অবহিত করেছে।

এভাবেই বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মধ্যে দিয়ে একটি স্কুল আস্তে আস্তে বদলে যাচ্ছে। স্কুল যে খালি শিশুকে পড়াশুনা করানোর জন্যই হবে এমনটি নয়। স্কুলে এসে শিশুরা আচরণের পরিবর্তন, স্বপ্ন দেখা, পরিকল্পনা করতে শেখা, অপরকে সাহায্য করা, সঞ্চয় করা – এই ব্যাপারগুলোও যে শিখতে পারে সেটিই দেখা গেল ‘ইচ্ছে জমা করি’ প্রোজেক্টে। তাদের এই কাজের স্বীকৃতি হিসাবে ‘সেরা স্কুল’ হিসাবে তারা পুরষ্কার পেয়েছে।

স্কুলের শিশুরা, শিক্ষক, এবং অভিভাবকরা মিলে যে স্কুলকে কেবল পড়াশুনার কেন্দ্র থেকে বদলে প্রকৃতভাবেই ‘মানুষ গড়ার কারখানা’ হিসাবে বদলে দিতে পারে তারই চমৎকার একটি উদারহণ হচ্ছে Cherry Blossoms Int’l School & College.

এখানে তো আমরা কেবল একটি স্কুলের গল্প বললাম। এভাবেই ঢাকার ৫০ টি স্কুলে প্রতিদিন ঘটে যাচ্ছে কিছু না কিছু পরিবর্তনের গল্প। আমাদের ইচ্ছে থাকবে এই পরিবর্তনের গল্পগুলো চলমান থাকুক। এবং আগ্রহী স্কুল, শিক্ষক এবং অভিভাবক যারা আছেন তারা এরকম কার্যক্রমগুলো নিজেদের স্কুলে চালু করতে চাইলে যোগাযোগ করতে পারেন আমাদের সাথে।

যোগাযোগ করুনঃ তানজিম হক, ০১৯২৯১১১১৩৩  

……………………………………………………………………………………………………………

Light of Hope এর Kids Time এ জানুয়ারি সেশনে ভর্তি শুরু হয়েছে। আপনার শিশুর সৃজনশীলতা বাড়াতে এবং শিশুকে বিভিন্ন একটিভিটির সাথে যুক্ত করতে চলে আসুন আমাদের ধানমণ্ডি সেন্টারে।

এছাড়া ধানমণ্ডিসহ আমাদের উত্তরা, গুলশান এবং মিরপুর সেন্টারে ভর্তি চলছে। বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন নিচের ছবিতে।

সরাসরি কথা বলতে কল করুন এই নাম্বারেঃ ০১৭৭১৫৮৮৪৯৪  

জানুয়ারি সেশনে ভর্তি চলছে Kids Time এর ৪ টি সেন্টারে।