আমাদের কাছে শিক্ষকরা যখন নানা বিষয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে আসেন তখন বেশিরভাগ শিক্ষকরাই শ্রেণীকক্ষে শিক্ষার্থীদের নানারকম সমস্যার কথা বলে থাকেন। যেমন, কিছু শিশু ক্লাসে কথা বলে না, আবার কিছু শিশু এতো বেশি কথা বলে যে ক্লাস নেয়া খুব কঠিন হয়ে যায়, আবার কিছু শিশু আছে যারা ক্লাসে অনেক প্রশ্ন করে এবং অনেক সময় তাদের প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে ক্লাসের সময় শেষ হয়ে যায় আর নির্ধারিত পাঠ শেষ করতে পারেন না ইত্যাদি ইত্যাদি। এগুলো সবই শিশুদের স্বভাবজাত। শিক্ষক হিসাবে আপনাকে মনে রাখতে হবে যে প্রতিটি শিশুই আলাদা, তাদের শেখার ধরণ আলাদা। আর শিশুরা তাদের স্বভাবজাত কৌতূহল থেকে অনেক প্রশ্ন করে এবং শিক্ষক হিসাবে আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে সেই প্রশ্নগুলোর শান্তভাবে দেয়া।

বাংলাদেশে আমাদের ক্লাসগুলোতে সাধারণত শিক্ষার্থী সংখ্যা অনেক বেশি থাকে। প্রতিটি ছাত্রছাত্রীকে আলাদা করে সময় দেয়া অনেক সময় সম্ভব হয়ে উঠে না। আবার শিক্ষকদের উপর চাপ থাকে যেন সময়মত সিলেবাস শেষ করা হয়। এরকম নানাবিধ কারণে ভালো ক্লাসরুম ম্যানেজমেন্ট একটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

উপরে উল্লেখ করা উদারহণগুলোসহ এরকম আরও যেসব পরিস্থিতির শিকার শিক্ষকরা হচ্ছেন তাদের জন্য কিছু কৌশল নিচে দেয়া হল –

১। গ্রুপে কাজ দিনঃ

যে সব শিশুরা ক্লাসে কথা বলে না বা অনেক কম কথা বলে তাদেরকে দলে বা গ্রুপে কাজ দিবেন এবং মনিটর করবেন। দলের কাজ শেষ হলে তাদের দিয়ে কাজের বিবরণ নিবেন। ক্লাস শেষে তাদের দিয়ে ক্লাস রিভিউ করাবেন। এতে করে সে গ্রুপের কাজ মনোযোগ দিয়ে করবে এবং সবার সামনে কোন একটা বিষয়ে বলার অভ্যাস তৈরি হওয়ার মাধ্যমে তার মধ্যে নিজেকে গুটিয়ে রাখার প্রবণতা কমবে।

২। ক্লাস মনিটর নিয়োগ করুনঃ

যেসব ছাত্রছাত্রী অনেক বেশী কথা বলে তাদের ক্লাসে মেনটর করে দিন এবং বলেন ক্লাস মনিটর করতে, কারা বেশী কথা বলে তাদের নাম নোট বইয়ে লিখতে বলুন। এতে করে তারা এই কাজটিতেই বেশী মনোযোগী হবে নিজেরা আর বেশী কথা বলবে না। আপনি ভালভাবে ক্লাস নিতে পারবেন।

৩। শিশুর কাছেই জানতে চান উত্তরঃ

যেসব শিশুরা অনেক প্রশ্ন করে তাদের আপনি নিজেই প্রতিটি নির্দেশনার পরপরই প্রশ্ন করুন এবং সঠিক উত্তর জানতে চান। এতে তারা অহেতুক প্রশ্ন করবে না। তবে জানার আগ্রহ থেকে যদি কোনও প্রশ্ন করে থাকে তাহলে অবশ্যই তার সঠিক উত্তর দিন। নিজে এই মুহূর্তে যা জানলে বলুন যে আপনি জেনে তাকে বলবেন। এবং পরে অবশ্যই মনে করে পরের ক্লাসে তার জবাব দিন।

৪। হয়ে যান গল্পকারঃ

যে পাঠটি ক্লাসে পড়াবেন তার সাথে সম্পর্ক রেখে পাঠ শুরুর আগে একটি গল্প বলুন। শিশুরা গল্প শুনতে পছন্দ করে।

৫। ‘দুষ্টু টেবিল’ বসান ক্লাসেঃ

যেসব শিশুরা ক্লাসে অন্য শিশুদের পেন্সিল দিয়ে খোঁচাখুঁচি করে বা নানা উপায়ে বিরক্ত করে, তাদের জন্য আপনার পাশে একটি ডেস্ক বা টেবিল রাখেন যেখানে তাদের বসতে দিন এবং এই টেবিল/ডেস্কের নাম দিয়ে দিন “দুষ্টু টেবিল/ডেস্ক” আর বলে দিন যারা দুষ্টুমি করবে তাদের এই “দুষ্টু টেবিলে” বসানো হবে। কোন শিশুই নিজেকে দুষ্টু হিসেবে মানতে চায়না।

৬। ব্যাবহার করুন আকর্ষণীয় টিচিং এইডঃ

আপনি যদি প্রতিটি ক্লাসে আকর্ষণীয় এবং কালারফুল টিচিং এইড বাবহার করেন তাহলে প্রতিটি শিশুই পাঠ সম্পর্কে আগ্রহী হবে আর আপনার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনবে। এই কৌশল অবলম্বন করলে ক্লাসরুম ম্যানেজ করতে আর বেগ পেতে হবে না।

ভালো টিচিং এইডের জন্য আমাদের ইউটিউব চ্যানেলটি ভিসিট করুন। টিচিংয়ের কিছু কন্টেন্ট নিয়ে দেখতে পারেন এই সিরিজটি। ক্লিক করুন এখানে।

৭। আলাদা করে সময় দিনঃ

আপনার কাছে মনে হতে পারে কোন কোন শিশু ক্লাসে বুঝি অকারনেই চেঁচামেচি করে। এক্ষেত্রে ক্লাসে সময় না পেলেও ব্রেকটাইমে বা স্কুলের পরে তাদের সাথে কথা বলুন। হয়তো তাদের কথা বাড়িতেও কেউ শুনতে চায় না। হয়তো তাদের বাড়িতে শুধু শুনতে হয়, এটা করোনা ওটা করোনা। বাবা মায়ের হয়তো সময়ই হয়না তাদের কথা শুনার। আপনি একজন শিক্ষক। আপনাকে তারা অনেক কাছের কেউ বলে মনে করে। আপনি তাদের কথা শুনুন আর সেভাবেই তাদের হ্যান্ডেল করুন।

৮। শিশুদের আবেগকে অবহেলা করবেন নাঃ

অনেক শিশু আছে যারা ক্লাসে অকারণেই ভয় পায় আর কান্নাকাটি করে। এটি বিশেষ করে ছোট শ্রেণীর ক্লাসের শিশুদের মধ্যে বেশি হয়। নতুন নতুন স্কুলে আসছে এমন শিশুদের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি দেখা যায়। মনে রাখবেন এই শিশুরা ভীষণ আবেগপ্রবণ, এরা অনেক ভালবাসা চায়, আদর চায়। এদের উপর বিরক্ত হবেন না। এদের সাথে কথা বলার সময় মাথায় হাত রেখে মা/বাবা বলে সম্বোধন করুন। ভয় কেটে যাবে, নির্দ্বিধায় কথা বলবে। আপনার ক্লাস প্রাণবন্ত হবে।

৯। গলার স্বরকে শানিত করুনঃ

ক্লাস নেয়ার সময় একই স্বরে কথা না বলে পাঠ এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী গলার স্বর উঠা নামা করান। এতে শিশুদের কাছে এবং আপনার কাছে  ক্লাস আর একঘেয়েমি লাগবে না।

১০। ক্লাসে নিজের জন্য ২৫% আর শিশুদের জন্য ৭৫% সময় বরাদ্দ রাখুনঃ

আপনি নিজে ক্লাসে পাঠ নিয়ে বেশী কথা না বলে শিশুদের বেশী কথা বলতে দিন, আলোচনা করতে দিন। তাহলে শিশুরা ক্লাসে অনেক বেশী মনোযোগী ও একাগ্র হবে।

 

কমবেশি প্রতিটি ক্লাসই এরকম শিশুরা উপরে উল্লেখ করা পরিস্থিতি তৈরি করে থাকে। আপনি ঠিক করুন আপনার ক্লাসের শিশুদের জন্য কোন কৌশলগুলো  প্রযোজ্য। তাদের উপর এই কৌশলগুলো প্রয়োগ করুন। এরপর ক্লাসে আপনার শিশুদের পরিবর্তন আপনি নিজেই অনুভব করুন।

 

……………………………………………………………………………………………………………

লেখাটি ভালো লাগলে অন্যদের সাথে শেয়ার করুন। আমাদের কাছে কোন বিষয়ের উপর লেখা দিতে চাইলে লেখাটি পাঠিয়ে দিন আমাদের মেইলে – [email protected]

 

লেখাটি দিয়েছেন রকিবা আহমেদ। তিনি লাইট অফ হোপে ডিরেক্টর হিসাবে কর্মরত আছেন। তিনি স্কুলের শিক্ষকদের নানা বিষয়ের উপর প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকেন।